এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে মহা দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তা নুরুজ্জামান । বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এনবিআরকে কুক্ষিগত করে শত শত কোটি টাকা কামিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলেও দিব্যি বুক ফুলিয়ে চলছেন এই সাবেক কাস্টমস কমিশনার একেএম নুরুজ্জামান । তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে বিগত সরকারের সময়। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দোহাই দিয়ে তখন দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের হওয়া একাধিক অভিযোগের তদন্তও বছরের পর বছর ঝুলে ছিলো এখনো আছে বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে নারি কেলেঙ্কারি সহ এমন কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম নেই, যার সঙ্গে তার নাম জড়ায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুর্নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গত পাঁচ বছর ধরে ফাইলবন্দি আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকার কারণেই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। জানা যায়, একেএম নুরুজ্জামানের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা থানাধীন শৈলঢুবি গ্রামে। কিন্তু কর্মজীবনে বাড়তি সুবিধা এবং রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়ার জন্য তিনি সবসময় নিজেকে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই ভুয়া পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের শীর্ষ পর্যায়ে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলেন। এমনকি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার ছবি জুড়িয়ে নানা রকম ফায়দা লুটেছেন ।বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীসহ অসংখ্য প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তির সঙ্গে তার সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এই ক্ষমতাশালী বলয়কে তিনি নিজের দুর্নীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেন।২০০৯ সালে তিনি ঢাকা দক্ষিণে পদায়িত ছিলেন। সেই সময় তার বিরুদ্ধে নিজ এলাকাবাসী ও আত্মীয়-স্বজনদের অবৈধভাবে চাকরি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ-দুর্নীতির বিষয়টি জনসমক্ষে চলে এলেও, তৎকালীন সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি অনায়াসেই পার পেয়ে যান।
২০১১ সালে ঢাকা পূর্ব বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ ওঠে। এরপর ২০১৩ সালটি ছিল তার দুর্নীতির অন্যতম কলঙ্কময় অধ্যায়। ওই বছর কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডিতে) পোস্টিং থাকাকালীন নিয়োগ বাণিজ্য এবং দেশব্যাপী আলোচিত গুঁড়া দুধ কেলেঙ্কারিতে তার নাম জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বরাবরের মতোই উপরমহলে নিজের প্রভাব খাটিয়ে তিনি পুরো পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নিয়ে আসেন এবং তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
একই বছর, অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর, নারায়ণগঞ্জের মাসুদ প্যাকেজিং, মেসার্স ইসলাম অ্যাসোসিয়েটসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভুয়া নথি তৈরি করে ডুপ্লেক্স বোর্ড কাগজ আমদানি করে চোরাকারবারের অভিযোগে মামলা করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এছাড়াও আদমজী ইপিজেডকেন্দ্রিক মেসার্স আঙ্কেল প্যাকেজিং লিমিটেড নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগে মামলা হয়। এসব চাঞ্চল্যকর মামলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করে, এবং সেই তদন্তেও এনবিআরের এই প্রভাবশালী কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার সুস্পষ্ট অভিযোগ উঠে আসে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও দেশের কয়েকটি স্থলবন্দর থেকে শুরু করে রাজধানীর ইসলামপুর ও নয়াবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এক বিশাল চোরাই পণ্যের সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটকে নেপথ্যে থেকে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা দিতেন সাবেক এই ভ্যাট কমিশনার। রাজস্ব বিভাগের বন্ড কমিশনারেট, শুল্ক গোয়েন্দা এবং সিআইডির একাধিক অনুসন্ধানে এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে নুরুজ্জামানের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে। কিন্তু ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি বারবার এসব রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়েছেন।
২০১৭ সালের ২০ আগস্ট পুরান ঢাকার গুলশান আরা সিটি মার্কেটের সামনে একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাই পণ্য উদ্ধার করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মাসটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সৈয়দ আবিদুল ইসলাম, মিজানুর রহমান ও খন্দকার সুরাত আলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্তভার যায় সিআইডির হাতে। সিআইডির নিবিড় তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শতকোটি টাকারও বেশি শুল্ক ফাঁকির ভয়াবহ তথ্য মেলে। এই বিশাল শুল্ক ফাঁকির ঘটনার নেপথ্যেও একেএম নুরুজ্জামানের সখ্যতা ও মদদের অভিযোগ উঠে আসে।চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মিজানুর রহমান দীপু চাকলাদার ও হাবিবুর রহমান অপু চাকলাদার নামের দুই সহোদরের শুল্ক ফাঁকি ও চোরাকারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে শুল্ক গোয়েন্দা। সে সময় দীপুকে গ্রেফতারও করা হয়। ২০১৩ সালের ২৩ জানুয়ারি মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। অপুর মালিকানাধীন মেসার্স চাকলাদার সার্ভিস ও দীপুর মালিকানাধীন এমআর ট্রেডিংয়ের সঙ্গে কাস্টমস কমিশনার একেএম নুরুজ্জামানের গভীর সখ্যতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থের অভিযোগ রয়েছে।২০১৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত অবস্থায় একেএম নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। চট্টগ্রামে পোস্টিং থাকা অবস্থায় বন্দর থেকে ফেব্রিকস বোঝাই আস্ত কনটেইনার চুরির সঙ্গে তার সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাটি নিয়ে সে সময় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সূত্র জানায়, মামলাটি ধামাচাপা দিতে তিনি তৎকালীন সাবেক আইনমন্ত্রীকে মোটা অংকের অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি এবং মামলাটি এখনও চলমান রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২২ সালে ঢাকা পানগাঁওয়ে একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ সিগারেট ও দামি মদের কনটেইনার গায়েব হয়ে যায়। এই গায়েবের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আসামি করা হয় একেএম নুরুজ্জামানকে। এই মামলাটি বর্তমানে মহামান্য হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে।দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন নুরুজ্জামান। পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, নুরুজ্জামান ও তার স্ত্রী পাপিয়া দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। ছেলের নাম দাইয়ান এবং মেয়ের নাম নিশাত। তার মেয়ে নিশাত বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় নুরুজ্জামানের আলিশান বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি ও বেনামে বিপুল সম্পত্তি রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
রাজধানীর অদূরে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় স্ত্রী পাপিয়ার নামে গড়ে তুলেছেন একটি বিশাল গার্মেন্টস কারখানা। এই কারখানাটি মূলত পরিচালনা করেন তার চাচাতো ভাই মহিউদ্দিন। নিজে বসবাস করেন রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাড়িতে। একই ভবনের পাশের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তার শ্যালক হাবিবুর রহমান হেন্ডি। ধারণা করা হয়, আত্মীয়-স্বজনদের নামেও তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ লুকিয়ে রেখেছেন।দীর্ঘদিনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসন ও দুদক এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে নি। এনবিআর সূত্র বলছে নুরুজ্জামানের মত মহা দুর্নীতিবাজ ও নারী কেলেঙ্কারি অভ্যস্ত কর্মকর্তা তারা ইতিপূর্বে দেখেননি ।তাই অবিলম্বে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তসহ তাকে গ্রেফতারের দাবী জানিয়েছে এনবিআর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ।
মন্তব্য করুন